মো. সহিদুল ইসলাম
স্বাধীনতার স্বাদ, সেতো ছিলো বহুল কাঙ্ক্ষিত-আকাঙিক্ষত
চরম আরাধ্য বললেও বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না।
মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, স্বৈরাচারের বাংলাদেশ দেখেছি
দেখেছি, চেতনাধারী শকুন-হায়েনাদের পাশবিকতা ।
কসাইখানার মতো রক্তস্নাত এদেশে জল্লাদের প্রলয়োল্লাস দেখেছি
দেখেছি, পুলিশের গুলিতে রাস্তার পাশে সারি সারি লাশের স্তুপ।
ভ্যানে করে নিয়ে আসা মৃত কিংবা অর্ধমৃত মানুষকে পুড়িয়ে ফেলার দৃশ্য দেখেছি।
আরো দেখেছি, দু হাত প্রসারিত শরীরে পুলিশের গুলি খাওয়া শহীদ সাঈদের নিষ্পাপ সরলতা।
কি অপরাধ ছিলো মুগ্ধের? পানি পান করানোর পরিণামও যে মৃত্যু, হয়তো সে তা কখনোই ভাবেনি।
স্বাধীন দেশে আয়নাঘরের মতো ভয়ংকর এক মরণশালা সম্পর্কেও কেই-বা ভেবেছে?
আবরার কি ভেবেছিলো, দেশের স্বার্থ নিয়ে সামান্য ফেসবুক স্ট্যাটাস তার নির্মম মৃত্যু ডেকে আনবে!
না ভাবেনি! ভাবেনি বলেই হয়তো সেদিন রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে কচুকাটা হয়েছিল দর্জি বিশ্বজিৎ।
গুম-খুনের কথা বলছেনতো, সেতো ছিলো নৈমিত্তিক ব্যাপার।
গুপ্ত ঘাতকের বুলেট ছাড় দেয়নি দেশ মার্তৃকার সেবায় নিয়োজিত এদেশের বীর সেনাবাহিনীকেও।
পিলখানায় ঐদিন নাটক মঞ্চস্থ হয়, নিদারুন খুনের এক হৃদয়বিদারক নাটক
কুশীলবরা সেদিন অভিনয় করেনি, হত্যা করেছে, হত্যা।
এ দেশের বুকে গুলি চালিয়েছে, ক্ষত-বিক্ষত করেছে বীর সেনানীদের নিরস্ত্র দেহ।
কি বিভৎস সে দৃশ্য! কি নির্মম সে আর্তনাদ!
সাম্প্রদায়িকতা কিংবা জঙ্গীবাদের নামে আলেম সমাজের টুঁটি চেপে ধরা, সেতো ছিলো প্রাত্যহিক ব্যাপার।
হয়তো সেজন্যই রাতের আধারে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে অসংখ্য হেফাজত কর্মীকে।
হরিলুটের মাল ব্যাংক-শেয়ারবাজারের অবস্থাও তথৈবচ, ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি।
রিজার্ভের পরিসংখ্যান, সেওতো এক হাওয়াই মিঠাই।
তাতে কি! শাসক চেতনাধারী, তথাকথিত উন্নয়নকারী
তাছাড়া, অর্ধশতবর্ষী স্বজন হারানোর বেদনার সামনে এসব যে নিতান্তই নস্যি!
আর বিরোধীরাতো কেষ্ট বেটা মাত্র!
অবশ্য তাদের শরীর ছিল হালাল শক্তিতে ঠাসা।
না হয়, দশ কিংবা পনেরো জন তরুণ কিভাবে ঝাঁকি দিয়ে ফেলে দেয় রানা প্লাজা?
সেজন্যই হয়তো শাসক তাদের বিচার করেছে
ক্ষমতার ভীত পাকা করেছে। ফাঁসী দিয়েছে বেটাদের।
ভোটের অধিকারের কথা বলছেন, সেতো গত দেড় দশক ধরেই নেই।
দেশে সৃজনশীল পুলিশ আছে না! তারা শুধু অবৈধ ত্রাস সৃষ্টি করে সন্ত্রাসই করতে জানে না
গড়তে জানে অবৈধ সম্পদের পাহাড়ও, সম্রাজ্যবাদ কায়েমের ওস্তাদও তাঁরাই।
নিরীহ ছাত্র জনতার মুখ ছেপে ধরে মিথ্যা মামলা দিতেও তারা বিশেষ পারদর্শী।
সেখানে রাতের আঁধারে ভোট চুরি, সেতা এক মামুলি ব্যাপার মাত্র!
দীর্ঘদিনের যাঁতাকলে পিষ্ঠ জনগণ সবই মেনে নিয়েছে।
মানবে নাই বা কেন! আপামর জনগণের যে পকেট খালি, জামায় তালি।
টাকা কোথায়, টাকা টাকশালে? না, টাকা উন্নয়নের অবৈধ গর্ভে।
টাকা চেতনার ধ্বজ্জাধারীদের ড্রাইভারের পকেটে।
সকল দমন-পীড়নের মুখে হঠাৎ এক দিন কোটা সংস্কার প্রশ্নে রুখে দাঁড়ায় এদেশের ছাত্র-জনতা।
সমন্বয়কের ভূমিকায় সামনে আসে নাহিদ, আসিফ, সারজিস, বাকের, আসিফ, মাহফুজ ও নুসরাতরা
বেগবান হয় আন্দোলন
দেশব্যাপী গগন বিধারী শ্লোগান ওঠে, তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার!
কে বলেছে, কে বলেছে?—স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!
ঠিক তখনই, ক্ষমতার দখল ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে স্বৈরাচার
মহোৎসবে ছাত্র-জনতার উপর হামলে পড়ে তার পেটোয়া বাহিনী
ক্ষত-বিক্ষত হয় দেশ
উড়ে আসে হেলিকাপ্টার, রাস্তায় নামে সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এপিসি
সক্রিয় হয় স্নাইপার
পড়ে থাকে অবুঝ শিশুর নিথর দেহ।
গুলি না চালাতে নির্দেশনা চেয়ে রিট করে আইনজীবী মানজুর আল মতিন
মরিয়া হয়ে সন্তানতূল্য শিক্ষার্থীদের রক্ষায় গর্জে ওঠে এক বাঘিনী মা, ড. চেীধুরী সায়মা ফেরদৌস।
অভেদ্য প্রাচীর হয়ে হায়নাদের রুখে দাঁড়ায় হিরোখ্যাত শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল।
ড. মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীর ব্যথাতুর কন্ঠ তখন কাঁদো কাঁদো স্বরে আবৃত্তি করে, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’
ড. রোবায়েত ফেরদৌসের মতো দেশের অসংখ্য মুক্তমনা শিক্ষকরাও ছিলেন জুলাইয়ের আন্দোলনে
দিনমজুর, কৃষক, চাকুরিজীবী, রিকশাওয়ালা, হকার, দোকানী, অ্যাক্টিভিস্ট কে করেনি সে আন্দোলন?
ফুল ও চকলেট হাতে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন নারী এবং শিশুরাও।
সম্মুখ সমরে ক্যামেরা কিংবা মাইক্রোফোন হাতে সদা জাগ্রত থাকেন যমুনা টিভির সংবাদ কর্মীরা।
বাঁশের লাঠি হাতে শোষকের কালো থাবা থেকে তারেক আসে এদেশের অধিকার বুঝে নিতে
ঠিক তখনই, পিনাকী ভট্টাচার্যের বজ্রনিনাদ কন্ঠ ঘোষণা করে, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।
বিস্ফোরিত হয় ভিসুভিয়াস
স্বৈরাচার পতনের এক দফায় উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ
বাতাসে ভেসে আসে মুহুর্মূহু পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেল আর বারুদের গন্ধ।
পুলিশ ও শোষক হায়নাদের গুলিতে প্রাণ যায় হাজারো নিরীহ বাংলাদেশীর।
পালিয়ে যায় স্বৈরশাসক
অবসান ঘটে ক্ষমতালিপ্সু বর্বর এক নৃশংস যুগের।
বের হয় আনন্দ মিছিল
স্বস্থি কিংবা মুক্তির মিছিলে সেদিন এদেশের আপামর জনতাই শুধু রাজপথে নামেনি
সন্তানের সদ্য রক্তে রাঙা সে রাজপথে শহীদ জনক-জননীরাও নেমেছিল
আঁচল পেতে বারবার দাবী করছিলো, ‘স্বাধীন এ দেশে আমাদের সন্তানদের ফিরিয়ে দাও, ফিরিয়ে দাও’ বলে।
সন্তানহারা পিতা-মাতা কিংবা স্বজনের সে আর্তনাদে হয়তো সেদিন আল্লাহর আরশও কেপে উঠেছিলো
কিন্তু, খুনী কিংবা দোষরদের অন্তরাত্মা কাঁপেনি।
বিবেক কিংবা মনুষত্বের দংশনেও তারা দংশিত হয়নি, হয়তো হবেও না কখনো!
তবে স্বৈরাচারের পতনে এদেশ কিন্তু নেতৃত্বহীন হয়নি সেদিন
বরং যোগ্য নেতৃত্ব পেয়েছে।
ছাত্র-জনতার অনুরোধ ফেলতে পারেনি নোবেল বিজয়ী এদেশের সূর্য সন্তান
যোগ্য কাণ্ডারী হয়েই তিনি এদেশের হাল ধরেছেন।
নিঃসঙ্কোচে কাঁধে তুলে নিয়েছেন বৈষম্যহীন বিধ্বস্থ এ দেশ গড়ার ভার।
বাংলাদেশ এখন স্বপ্ন দেখে, আশা জাগানিয়া নতুন এক ভোরের প্রত্যাশা করে
সমানতালে আমরাও স্বপ্ন বুনি
বাস্তবায়নের প্রহর গুনি
হয়তো খুব নিকটেই আছে এ দেশের মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার
স্বাধীনতার স্বাদ।
স্বপ্নহীন চোখ বসন্ত খোঁজে না
রুদ্র সাহাদাৎ
উদভ্রান্ত যৌবন গন্তব্যহীন ছুটেচলা
স্বপ্নহীন চোখ বসন্ত খোঁজে না
উচ্চবিত্তের সুখের অসুখ, মধ্যবিত্ত দিশেহারা।
মাঝেমাঝে পথ হারাচ্ছি পথের মাঝে
কখন কোথায় কি করছি ঈশ্বর সবই জানে
নদীর মতন ছুটছি তারাপদমন....
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
